National Youth Day

আজ ১২ জানুয়ারি, স্বামী বিবেকানন্দের পবিত্র জন্মতিথি। প্রতি বছর এই দিনটিকে ভারতে ‘জাতীয় যুব দিবস’ (National Youth Day) হিসেবে পালন করা হয়। যা তাঁর কালজয়ী আদর্শ এবং যুবসমাজের প্রতি তাঁর অগাধ বিশ্বাসের এক অনন্য স্বীকৃতি। ঊনবিংশ শতাব্দীর পরাধীন ভারতবর্ষে যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদার রশদ পরিপূর্ণভাবে ভরে দিয়েছিলেন বিবেকানন্দ। এক কথায় সমগ্র দেশবাসীকে নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছিলেন। সন্ন্যাসী হয়েও তিনি ছিলেন একজন সমাজ সংস্কারক, দেশপ্রেমিক এবং বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্বের প্রবক্তা। তাঁর জীবন ও দর্শন আজও কোটি কোটি মানুষের কাছে এক অফুরন্ত প্রেরণার উৎস হয়ে রয়ে গিয়েছে।

জাতীয় যুব দিবস (National Youth Day)

১৮৬৩ সালের এই দিনে কলকাতার সিমলা পল্লীর ঐতিহ্যবাহী দত্ত পরিবারে নরেন্দ্রনাথ দত্তের জন্ম হয়। আদর করে তাঁকে নরেন বলেই ডাকা হত। পিতা বিশ্বনাথ দত্ত এবং মাতা ভুবনেশ্বরী দেবীর আদর্শে লালিত নরেন্দ্রনাথ বাল্যকাল থেকেই ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী এবং সত্যসন্ধানী। তাঁর চিন্তাশক্তি ও বিচারবুদ্ধি ছিল প্রখর। পাশ্চাত্য দর্শনে পণ্ডিত হয়েও তাঁর মনে ঈশ্বর লাভের তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল। সেই সময়েই তাঁর সাক্ষাৎ ঘটে দক্ষিণেশ্বরের ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের সঙ্গে। গুরুর কাছে নরেনের প্রশ্ন ছিল সোজা – ‘আপনি কি ঈশ্বর দেখেছেন?’ রামকৃষ্ণদেবের সহজ উত্তর ছিল – ‘হ্যাঁ দেখেছি, তোকেও দেখাতে পারি।’ এই মোক্ষম উত্তর নরেনের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। রামকৃষ্ণের সান্নিধ্যে এসে তিনি হয়ে ওঠেন স্বামী বিবেকানন্দ। গুরুর মহাপ্রয়াণের পর তিনি ভারতের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পরিব্রাজক হিসেবে ঘুরে বেড়ান। স্বচক্ষে দেখেন ভারতমাতার কঙ্কালসার চেহারা ও মানুষের সীমাহীন দুঃখ-কষ্ট-দারিদ্র্য। যা দেখে তাঁর হৃদয় কেঁদে ওঠে। সংকল্প করেন সমাজের চেহাড়া বদলাবেন।

বিবেকানন্দের জীবনের এক স্মরণীয় অধ্যায় হল ১৮৯৩ সালের শিকাগো ধর্ম মহাসম্মেলন। সেখানে ‘আমেরিকার ভাই ও বোনেরা’ বলে সম্বোধন করে তিনি যখন বক্তৃতা শুরু করেন, তখন সমগ্র বিশ্ব অবাক বিস্ময়ে হিন্দুধর্মের উদারতা ও মহানুভবতা প্রত্যক্ষ করেছিল (National Youth Day)। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, হিন্দুধর্ম কেবল কতগুলি আচার-অনুষ্ঠানের সমষ্টি নয়, বরং এটি এক গভীর বিজ্ঞানসম্মত জীবনদর্শন। শিকাগো থেকে ফেরার পর তিনি ভারতকে এক নতুন দিশা দেখান। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, খালি পেটে ধর্ম হয় না। তাই তিনি আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে জনসেবাকে যুক্ত করার কথা বলেন। তাঁর মূল মন্ত্র ছিল ‘শিবজ্ঞানে জীব সেবা’। অর্থাৎ প্রতিটি মানুষের মধ্যেই ঈশ্বর বিদ্যমান, তাই মানুষের সেবা করাই হল ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠ উপাসনা।

আরও পড়ুন: ভুল জায়গায় তুলসী গাছ রাখলেই বিপদ! বাস্তু মতে এই ৫টি স্থান আাদর্শ

বিবেকানন্দের দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল শক্তি এবং আত্মবিশ্বাস। তিনি বলতেন, দুর্বলতাই হল পাপ এবং মৃত্যুসমান। তিনি যুবসমাজের উদ্দেশ্যে ডাক দিয়েছিলেন – ‘উত্তিষ্ঠত জাগ্রত প্রাপ্য বরান নিবোধত’, অর্থাৎ ওঠো, জাগো এবং লক্ষ্যে না পৌঁছানো পর্যন্ত থেমো না। তিনি চেয়েছিলেন এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থা যা মানুষের চরিত্র গঠন করবে এবং তাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখাবে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘রামকৃষ্ণ মিশন’ এবং ‘বেলুড় মঠ’ আজও তাঁর সেই সেবার আদর্শকে সারা বিশ্বে প্রচার করে চলেছে। বেলুড় মঠ আজ কেবল একটি মঠ নয়, বরং তা পবিত্রতা ও ত্যাগের এক পীঠস্থান হয়ে উঠেছে। যুব সমাজকে আসল শিক্ষায় শিক্ষিত করার ক্ষেত্রেও মঠের অভালনীয় প্রচেষ্টা সকলের প্রশাংসা কুড়িয়ে চলেছে।

বিবেকানন্দের দেশপ্রেম ছিল অত্যন্ত গভীর। তিনি বিশ্বাস করতেন যে ভারত আবার বিশ্বগুরুর আসনে অধিষ্ঠিত হবে। তবে সেই উন্নতির চাবিকাঠি রয়েছে যুবসমাজের হাতে। তিনি চেয়েছিলেন এমন একদল যুবক, যাদের পেশি হবে লোহার মতো আর স্নায়ু হবে ইস্পাতের মতো। তাঁর দৃষ্টিতে প্রকৃত ধার্মিক সেই ব্যক্তি, যে দেশ ও দশের কল্যাণে নিজের জীবন উৎসর্গ করতে পারে। তিনি জাতিভেদ প্রথা এবং কুসংস্কারের ঘোর বিরোধী ছিলেন। সমাজকে এক সূত্রে বাঁধার স্বপ্ন দেখতেন যেখানে ধনী-দরিদ্র, উচ্চবর্ণ-নিম্নবর্ণের কোনো ভেদাভেদ থাকবে না।

স্বামী বিবেকানন্দ মাত্র ৩৯ বছর বয়সে ইহলোক ত্যাগ করলেও তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ চিরকাল অমর হয়েই থাকবে। বর্তমানের অস্থির সময়ে, যখন মানুষ আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে, এমন পরিস্থিতিতে বিবেকানন্দের ‘বহুরূপে সম্মুখে তোমার ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর’ – এই বাণী অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে এবং পরোপকারের মধ্য দিয়ে জীবনকে সার্থক করতে। আধুনিক ভারতের নির্মাতা হিসেবে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। আজকের এই বিশেষ দিনে বিবেকানন্দের জীবন আলোচনা কেবল তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন নয়, বরং আমাদের প্রত্যেকের জীবনের লক্ষ্য স্থির করার এক নতুন সুযোগ। তাঁর নির্দেশিত পথে চলেই (National Youth Day) আমরা এক সমৃদ্ধ ও মহান ভারত গড়ে তুলতে পারি।

By SubhadipDasgupta

Subhadip Dasgupta is the founding editor and a senior news writer at IndiaPress. He covers automobile launches, technology updates, national affairs and breaking news.

© 2026 IndiasPress | All Rights Reserved