ভারতে হালফিলে যে ওষুধগুলির সবচেয়ে বেশি অপব্যবহার হয়, তার মধ্যে অন্যতম অ্যান্টিবায়োটিক (Antibiotics Effects)। বর্তমানে তাপমাত্রার পারদ ক্রমশ নিচে নামার কারণে ঘরে ঘরে সাধারণ সর্দি-কাশি বা ‘কমন কোল্ড’ একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিজ্ঞানের ভাষায় সর্দি-কাশি মূলত ভাইরাসজনিত রোগ হলেও, অধিকাংশ মানুষ দ্রুত উপশম পেতে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই দোকান থেকে অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খেতে শুরু করেন।
সাধারণত সর্দি-কাশির পর অনেক সময় ব্যাকটেরিয়াল সাইনোসাইটিস বা অন্য কোনো সেকেন্ডারি ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যা থেকে বাঁচতে বা স্রেফ মানসিক শান্তির জন্য মানুষ এই ওষুধের আশ্রয় নেয়। কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসকরাও আগাম সতর্কতা হিসেবে এটি লিখে থাকেন। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে অ্যান্টিবায়োটিক এক যুগান্তকারী আবিষ্কার হলেও, সর্দি-কাশিতে এর ভুল ব্যবহার আমাদের শরীরের অন্ত্রের বা পাকস্থলীর স্বাস্থ্যের (Gut Health) ব্যাপক ক্ষতি করতে পারে।
অন্ত্রের স্বাস্থ্যের ওপর অ্যান্টিবায়োটিকের প্রভাব (Antibiotics Effects)
আমাদের অন্ত্র বা পরিপাকতন্ত্রে কোটি কোটি উপকারী ব্যাকটেরিয়ার এক বিশাল বাস্তুতন্ত্র রয়েছে। এই ব্যাকটেরিয়াগুলি খাবার হজম করা, পুষ্টি শোষণ এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অ্যান্টিবায়োটিকের একটি বড় সমস্যা হল, এটি শরীরে প্রবেশ করার পর কেবল ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াকেই মারে না, বরং এর পাশাপাশি শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলিকেও ধ্বংস করে ফেলে।
এই ভারসাম্যহীনতাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘ডিসবায়োসিস’। এই ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ফলেই অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার পর অনেকের পেট ফাঁপা, ডায়রিয়া বা পেটের গোলমাল দেখা দেয়। যখন এই উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলি কমে যায়, তখন অন্ত্রের অভ্যন্তরীণ দেওয়াল বা ‘গাট ব্যারিয়ার’ দুর্বল হয়ে পড়ে। একে বলা হয় ‘লিকি গাট’। এর ফলে অন্ত্রের ভেতর থাকা অপ্রয়োজনীয় উপাদান রক্তে মিশে যেতে পারে, যা সারা শরীরে প্রদাহ তৈরি করে। দীর্ঘমেয়াদে এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, ফলে ব্যক্তি আরও ঘন ঘন সংক্রমণে আক্রান্ত হতে পারেন।
আরও পড়ুন: নাক বন্ধের সমস্যা থেকে দ্রুত মুক্তি মিলবে, রইল আট কার্যকরী উপায়
অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের পর অন্ত্রের স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের উপায়
অ্যান্টিবায়োটিক কোর্স শেষ করার পর অন্ত্রের সেই হারানো ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি। নিচে এর জন্য কিছু কার্যকর টিপস দেওয়া হল:
১. প্রোবায়োটিকস: অন্ত্রে পুনরায় উপকারী ব্যাকটেরিয়া ফিরিয়ে আনার সবথেকে ভালো উপায় হল প্রোবায়োটিক গ্রহণ করা। ল্যাকটোব্যাসিলাস এবং বিফিডোব্যাকটেরিয়াম সমৃদ্ধ খাবার বা সাপ্লিমেন্ট এক্ষেত্রে খুব কার্যকর। দই বা ঘোলের মতো খাবার প্রোবায়োটিকের প্রাকৃতিক উৎস, যা হজম ক্ষমতা বাড়াতে এবং মাইক্রোবিয়াল ব্যালেন্স ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।
২. প্রিবায়োটিকস: কেবল নতুন ব্যাকটেরিয়া শরীরে ঢোকানোই যথেষ্ট নয়, তাদের টিকিয়ে রাখার জন্য খাবারের প্রয়োজন। প্রিবায়োটিক হল এক ধরনের তন্তু বা ফাইবার যা উপকারী ব্যাকটেরিয়ার খাদ্য হিসেবে কাজ করে। রসুন, পেঁয়াজ, কলা এবং অ্যাসপারাগাস প্রিবায়োটিকের চমৎকার উৎস। এগুলি নিয়মিত খেলে অন্ত্রের স্বাস্থ্য দ্রুত উন্নত হয়।
৩. সুষম খাদ্য: প্রাকৃতিক খাবার খাওয়ার দিকে নজর দিন। খাদ্যতালিকায় প্রচুর পরিমাণে তাজা ফল, শাকসবজি, গোটা শস্য এবং চর্বিহীন প্রোটিন রাখুন। এই খাবারগুলি অন্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করে শরীরকে সুস্থ করে তোলে।
৪. পর্যাপ্ত জল পান: শরীরকে হাইড্রেটেড রাখা সার্বিকভাবে স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য। জল অন্ত্রের শ্লেষ্মা স্তর বা মিউকোসাল লাইনিং বজায় রাখতে সাহায্য করে। যা পরিপাকতন্ত্রকে সুস্থ রাখে এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দূর করে।
৫. চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার বর্জন: অতিরিক্ত চিনি এবং প্যাকেটজাত খাবার অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ক্ষতি করে এবং ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার বংশবৃদ্ধিতে সাহায্য করে। তাই অন্ত্রের ভারসাম্য ফেরাতে মিষ্টি জাতীয় খাবার এবং ফাস্ট ফুড যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলুন।
৬. ধীরে ধীরে খাবারের প্রবর্তন: অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসার (Antibiotics Effects) পর সরাসরি ভারী খাবার না খেয়ে ধীরে ধীরে নতুন নতুন খাবার তালিকায় যোগ করুন। কোনো নির্দিষ্ট খাবারে আপনার পেটে সমস্যা হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করুন এবং সেই অনুযায়ী ডায়েট চার্ট তৈরি করুন।
৭. বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন: যদি অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের পর দীর্ঘ সময় ধরে পেটের সমস্যায় ভোগেন বা হজমে বড় কোনো গোলমাল দেখেন, তবে দেরি না করে একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিন।
পরিশেষে মনে রাখবেন, অ্যান্টিবায়োটিক (Antibiotics Effects) কোনো সাধারণ ব্যথানাশক ওষুধ নয়। এটি ব্যবহারের আগে সঠিক রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বাধ্যতামূলক। সঠিক নিয়ম মেনে চললে আমরা যেমন রোগমুক্ত থাকব, তেমনই আমাদের অন্ত্রের স্বাস্থ্যও থাকবে সুরক্ষিত।
সতর্কীকরণ: এই প্রতিবেদনে দেওয়া পরামর্শগুলি কেবলমাত্র সাধারণ তথ্যের উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছে। এটি কোনোভাবেই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মতামতের বিকল্প নয়। আপনার শারীরিক অবস্থা বা চিকিৎসা সংক্রান্ত আরও তথ্যের জন্য সর্বদা নিজের ডাক্তার বা বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করুন। ইন্ডিয়াসপ্রেস (IndiasPress.com) এই তথ্যের দায়ভার বহন করে না।
