এলাহাবাদ হাইকোর্ট (Allahabad High Court) সম্প্রতি এক যুগান্তকারী রায় দিয়েছে। আদালত জানিয়েছে, যদি স্ত্রীর কোনো কাজ বা আচরণের কারণে স্বামীর উপার্জনের ক্ষমতা নষ্ট হয়, তবে সেই স্ত্রী আইনত স্বামীর কাছে খোরপোশ বা ভরণপোষণ দাবি করতে পারেন না। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, যেখানে স্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের অপরাধমূলক কাজের ফলে স্বামীর জীবন ও জীবিকা বিপন্ন হয়েছে, সেখানে খোরপোশ মঞ্জুর করা হবে চরম অন্যায়ের শামিল। বিচারপতি লক্ষ্মী কান্ত শুক্লার একক বেঞ্চ কুশীনগরের একটি ফ্যামিলি কোর্টের পুরনো রায় বহাল রেখে এই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণটি দিয়েছেন।
জামাইকে পঙ্গু করেছে শ্যালক ও শ্বশুর
এই মামলার নেপথ্যে রয়েছে এক মর্মান্তিক ঘটনা। মামলার আবেদনকারী মহিলা তাঁর স্বামী বেদ প্রকাশ সিংয়ের কাছ থেকে খোরপোশ দাবি করেছিলেন। বেদ প্রকাশ সিং পেশায় একজন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক ছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ক্লিনিক চলাকালীন পারিবারিক বিবাদের জেরে চিকিৎসকের শ্যালক এবং শ্বশুর তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালান। সেই হামলার ফলে তিনি গুরুতরভাবে আহত হন এবং তাঁর উপার্জনের ক্ষমতা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। বর্তমানে ওই চিকিৎসকের মেরুদণ্ডে একটি গুলির অংশ (পেলেট) আটকে রয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, ওই পেলেট অস্ত্রোপচার করে বের করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ এতে তাঁর চিরতরে প্যারালাইসিস হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। শারীরিক এই অবস্থার কারণে তিনি দীর্ঘক্ষণ সোজা হয়ে বসতে পারেন না এবং কোনো কাজ বা চাকরিতে নিযুক্ত হওয়া তাঁর পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যুগান্তকারী রায় আদালতের (Allahabad High Court)
নিম্ন আদালতের রায়কে চ্যালেঞ্জ করে ওই মহিলা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। তবে এলাহাবাদ হাইকোর্ট কুশীনগর ফ্যামিলি কোর্টের ২০২৫ সালের ৭ মে-র সিদ্ধান্তকে বহাল রেখেছে। নিম্ন আদালত ওই মহিলার অন্তর্বর্তীকালীন খোরপোশের আবেদন খারিজ করে দিয়েছিল। হাইকোর্ট জানিয়েছে, স্বামীর শারীরিক অক্ষমতার বিষয়টি নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই এবং এই অক্ষমতার জন্য সরাসরি দায়ী স্ত্রীর পরিবার। আদালত স্পষ্ট ভাষায় বলেছে যে, স্ত্রী বা তাঁর পরিবারের সদস্যদের কার্যকালাপের কারণে যদি স্বামী জীবিকা নির্বাহের পথ হারান, তবে স্ত্রী সেই পরিস্থিতির সুবিধা নিয়ে খোরপোশ দাবি করতে পারেন না।
বিচারপতি শুক্লা তাঁর পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছেন যে, ভারতীয় সমাজব্যবস্থায় সাধারণত আশা করা হয় যে স্বামী কাজ করবেন এবং পরিবারের ভরণপোষণ করবেন। কিন্তু এই মামলার প্রেক্ষাপট এবং পরিস্থিতি একেবারেই স্বতন্ত্র। আইনত স্বামীর ওপর তাঁর স্ত্রীর ভরণপোষণের নৈতিক ও ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা থাকলেও, কোনো আদালত স্ত্রীর ওপর এমন কোনো সুনির্দিষ্ট আইনি দায়ভার চাপায়নি। বর্তমান ক্ষেত্রে প্রথম দৃষ্টিকোণ থেকেই এটি পরিষ্কার যে, স্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের আচরণই ওই ব্যক্তিকে পঙ্গু করে দিয়েছে। এই অবস্থায় যদি আদালত খোরপোশ মঞ্জুর করে, তবে তা হবে অমানবিক এবং ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
আরও পড়ুন: ভারতীয় সেনা দিবসের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট কী? জানুন এ বছরের থিম
আদালত (Allahabad High Court) আরও যোগ করেছে, বিচারব্যবস্থা রেকর্ডে থাকা বাস্তবতাকে এড়িয়ে যেতে পারে না। যখন নথিপত্র স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে স্বামী কেন উপার্জনে অক্ষম, তখন সেই সত্যকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। স্ত্রীর নিজের বা তাঁর আত্মীয়দের কাজ যখন স্বামীর উপার্জনের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়, তখন খোরপোশ চাওয়ার অধিকার নৈতিকভাবে নষ্ট হয়ে যায়। এই রায়ের ফলে এটি পুনরায় স্পষ্ট হল যে, খোরপোশের আইন কেবল অধিকার রক্ষার জন্য, অন্যের জীবন ধ্বংস করে ফায়দা তোলার জন্য নয়। হাইকোর্ট আবেদনকারী মহিলার রিভিশন পিটিশনটি সম্পূর্ণভাবে খারিজ করে দিয়েছে।
