ভারতে টেলিকম এবং নেটওয়ার্কিং পণ্যের উৎপাদনে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রোডাকশন লিঙ্কড ইনসেনটিভ বা পিএলআই (PLI) প্রকল্প এক অভাবনীয় পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। অর্থ মন্ত্রকের পক্ষ থেকে শেয়ার করা সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, এই প্রকল্পের মাধ্যমে দেশে কেবলই উৎপাদন বাড়ছে না, বরং একটি শক্তিশালী ৫জি ইকোসিস্টেম গড়ে উঠছে। দেশীয় উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়ে আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানোর যে লক্ষ্য নিয়ে সরকার এগিয়েছিল, তার বাস্তব প্রতিফলন এখন পরিসংখ্যানের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ভারতের এই যাত্রা বিশ্ববাজারে দেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে।
সরকারি তথ্য কী বলছে? (PLI)
সরকারি তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, টেলিকম সেক্টরে মোট ৪২টি কোম্পানিকে এই প্রকল্পের আওতায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২৮টি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (MSME) এবং ১৪টি বড় মাপের কোম্পানি। এই সংস্থাগুলি সম্মিলিতভাবে ৪,০১৪ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, এই ক্ষেত্রে প্রকৃত বিনিয়োগের পরিমাণ ইতিমধ্যে ৪,৬৪৬ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছে। এই লগ্নির সুফল হিসেবে টেলিকম যন্ত্রাংশ বিক্রির মোট অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ৯৬,২৪০ কোটি টাকা। যার মধ্যে ১৯,২৪০ কোটি টাকাই এসেছে বিদেশে রপ্তানি থেকে। এই বিশাল অঙ্কের রপ্তানি প্রমাণ করে যে ভারতীয় পণ্য আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকছে।
বিনিয়োগ এবং বিক্রির পাশাপাশি কর্মসংস্থান তৈরির ক্ষেত্রেও এই পিএলআই (PLI) প্রকল্প এক মাইলফলক তৈরি করেছে। শিল্প মহলের তথ্য অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত প্রায় ৩০,০০০ মানুষ এই প্রকল্পের মাধ্যমে সরাসরি নতুন চাকরি পেয়েছেন। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার কথা ভাবলে, আগামী কয়েক বছরে এই সংখ্যা ৪৪,০০০ ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। মূলত নকশা-ভিত্তিক উৎপাদন বা ‘ডিজাইন-লেড ম্যানুফ্যাকচারিং’ ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে যাতে ৫জি প্রযুক্তির মতো অত্যাধুনিক নেটওয়ার্কিং হার্ডওয়্যার তৈরিতে ভারতকে অন্য কোনো দেশের ওপর নির্ভর করতে না হয়।
পিএলআই (PLI) প্রকল্পের এই জয়যাত্রা কেবল টেলিকম খাতেই সীমাবদ্ধ নেই, গৃহস্থালির ইলেকট্রনিক সামগ্রীর ক্ষেত্রেও এর প্রসার ঘটছে। সম্প্রতি পাঁচটি কোম্পানিকে এই প্রকল্পের আওতায় বাছাই করা হয়েছে যারা ৮৬৩ কোটি টাকার অতিরিক্ত বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই তালিকায় গোদরেজ অ্যান্ড বয়েস এবং কির্লোস্কার নিউমেটিকের মতো নামজাদা সংস্থাগুলি রয়েছে। আশা করা হচ্ছে যে, ২০২৭-২৮ সালের মধ্যে এই উদ্যোগের মাধ্যমে ৮,৩০০ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের যন্ত্রাংশ তৈরি হবে এবং আরও প্রায় ১,৮০০ সরাসরি কর্মসংস্থান তৈরি হবে। এসির কম্প্রেসর থেকে শুরু করে এলইডি লাইটের ড্রাইভার – সবই এখন ভারতের মাটিতে তৈরি করার প্রস্তুতি চলছে।
আরও পড়ুন: লঞ্চের আগেই ফাঁস ডিজাইন ও দাম, ফেব্রুয়ারিতে আসছে Vivo V70 Series
প্রসঙ্গত, সরকারের এই সামগ্রিক কৌশলের অন্যতম বড় লক্ষ্য মূল্য সংযোজন বা ‘ভ্যালু এডিশন’ বৃদ্ধি করা। বর্তমানে এসি বা এলইডি লাইটিংয়ের মতো ক্ষেত্রে ভারতের নিজস্ব মূল্য সংযোজন ২০-২৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ, যা প্রকল্পের প্রভাবে আগামীতে ৭৫-৮০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে ভারত কেবল একটি অ্যাসেম্বলি হাব হিসেবে নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ ম্যানুফ্যাকচারিং পাওয়ার হাউস হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। এই সুনির্দিষ্ট ইনসেনটিভ ব্যবস্থা ভারতকে বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খল বা গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনের একটি অপরিহার্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করছে।
