আজ ২ মে ২০২৬, বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্রকার ও সাহিত্যিক সত্যজিৎ রায়ের ১০৫তম জন্মবার্ষিকী (Satyajit Ray Birthday)। ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তো বটেই, বিশ্ব চলচ্চিত্রের মানচিত্রেও তাঁর নাম এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো জাজ্বল্যমান। ১৯২১ সালের এই দিনে কলকাতার বিখ্যাত রায় পরিবারে তাঁর জন্ম হয়। পিতা সুকুমার রায় এবং পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী – উভয়েই ছিলেন বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তি। ফলে শৈশব থেকেই এক গভীর সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে উঠেছিলেন তিনি।
বিশ্বভারতী থেকে চিত্রাঙ্কনে ডিগ্রী (Satyajit Ray Birthday)
সত্যজিৎ রায়ের বহুমুখী প্রতিভা কেবল চলচ্চিত্র পরিচালনাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি একাধারে লেখক, চিত্রনাট্যকার, সঙ্গীত পরিচালক, চিত্রশিল্পী এবং ক্যালিগ্রাফার হিসেবেও বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক হওয়ার পর তিনি শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে চিত্রাঙ্কন শিখতে যান। ১৯৪৩ সালে একটি ব্রিটিশ বিজ্ঞাপন সংস্থায় ভিজ্যুয়ালাইজার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও তাঁর হৃদয়ে সিনেমার প্রতি টান ছিল শৈশব থেকেই।
আরও পড়ুন: ‘লাস্যময়ী’ তকমা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল! গ্ল্যামার দুনিয়া ছেড়ে বাস্তবতাতেই স্বাচ্ছন্দ্য সমীরা
১৯৫০ সালে কাজের সূত্রে লন্ডন থাকাকালীন তিনি (Satyajit Ray Birthday) প্রায় ১০০টি চলচ্চিত্র দেখেন, যার মধ্যে ভিত্তোরিও ডি সিকা-র ‘বাইসাইকেল থিভস’ তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ১৯৫৫ সালে বহু প্রতিকূলতা পেরিয়ে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস অবলম্বনে মুক্তি পায় তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র ‘পথের পাঁচালী’। এই সিনেমাটি ভারতীয় চলচ্চিত্রকে প্রথমবার আন্তর্জাতিক আঙিনায় এক অনন্য সম্মান এনে দেয়। অপুর সেই যাত্রাপথ পরবর্তীকালে ‘অপরাজিত’ ও ‘অপুর সংসার’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পূর্ণতা পায়, যা বিশ্বজুড়ে ‘অপু ট্রিলজি’ নামে পরিচিত।
সত্যজিৎ রায়ের জীবন থেকে অনুপ্রাণিত হওয়ার মতো অসংখ্য ঘটনা রয়েছে, তবে তাঁর কর্মনিষ্ঠা ও চারিত্রিক দৃঢ়তার একটি বিশেষ ঘটনা আজও স্মরণীয় হয়ে আছে। ‘পথের পাঁচালী’ তৈরির সময় তাঁর কাছে পর্যাপ্ত অর্থ ছিল না। এমনকি শুটিং চালিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি তাঁর বিমা পলিসি ভাঙিয়েছিলেন এবং স্ত্রী বিজয়া রায়ের গয়না পর্যন্ত বন্ধক রাখতে হয়েছিল। অর্থের অভাবে দীর্ঘ দেড় বছর শুটিং বন্ধ ছিল। এমন সময় তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। অনেকেই মনে করেছিলেন এটি হয়তো একটি তথ্যচিত্র হবে, কিন্তু মুক্তির পর যখন এটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে ‘বেস্ট হিউম্যান ডকুমেন্ট’ পুরস্কার পেল, তখন গোটা বিশ্ব বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। নিজের স্বপ্নের প্রতি এই আপসহীন লড়াই সত্যজিৎ রায়কে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল।
চলচ্চিত্রের পাশাপাশি বাংলা সাহিত্যেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। ফেলুদা এবং প্রফেসর শঙ্কু – এই দুই অমর চরিত্র সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি কয়েক প্রজন্মের কিশোরদের কল্পনার জগৎকে সমৃদ্ধ করেছেন। তিনি ‘সন্দেশ’ পত্রিকা পুনরায় সম্পাদনা শুরু করেন, যা কিশোর সাহিত্যের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৯৮৪ সালে তিনি ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র সম্মান ‘দাদাসাহেব ফালকে’ পুরস্কার পান এবং ১৯৯২ সালে শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেও হাসপাতালের শয্যায় বসেই তিনি বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সম্মান ‘অস্কার’ (লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট) গ্রহণ করেন। ওই বছরই তিনি ভারতের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ‘ভারত রত্ন’ লাভ করেন।
আজ তাঁর ১০৫তম জন্মবার্ষিকীতে (Satyajit Ray Birthday) আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁকে স্মরণ করি। তাঁর সৃষ্টি কেবল রূপোলি পর্দার গল্প নয়, বরং তা ছিল মানবিক বোধ ও জীবনের এক গভীর দর্শন। তিনি শিখিয়েছেন কীভাবে সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেও বিশ্বজয়ী শিল্পকর্ম সৃষ্টি করা যায়। বাঙালির কাছে সত্যজিৎ রায় কেবল একজন পরিচালক নন, তিনি এক চিরন্তন আবেগ এবং বিশ্ব সংস্কৃতির এক মহীরুহ।

