ভারতের সার্বভৌমত্ব এবং অখণ্ডতা রক্ষায় যারা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেন, সেই বীর জওয়ানদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানানোর দিন ১৫ জানুয়ারি। কারণ আজ ভারতীয় সেনা দিবস (Indian Army Day 2026)। সীমান্ত রক্ষা থেকে শুরু করে প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা যে কোনো জাতীয় জরুরি পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের সেবায় অবিচল ভারতীয় সেনাবাহিনী। প্রতি বছরের মতো এ বছরের ১৫ জানুয়ারি দিনটিও অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে পালিত হচ্ছে। দেশমাতৃকার সেবায় জওয়ানদের নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ এবং অদম্য বীরত্বকে সম্মান জানাতেই দেশজুড়ে এই বিশেষ দিনটির আয়োজন করা হয়।
সেনা দিবসের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
এই দিনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ভারতের সামরিক ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৪৯ সালের ১৫ জানুয়ারি স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। এই দিনেই ব্রিটিশ সেনাপ্রধান জেনারেল স্যার ফ্রান্সিস বুচারের কাছ থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন ফিল্ড মার্শাল কে. এম. কারিয়াপ্পা (K.M. Cariappa)। তিনি ছিলেন স্বাধীন ভারতের প্রথম ভারতীয় কম্যান্ডার-ইন-চিফ। এই ক্ষমতা হস্তান্তরটি ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর ভারতের সম্পূর্ণ সামরিক স্বাধীনতার এক বলিষ্ঠ প্রতীক। ২০২৬ সালে ভারত এই ঐতিহাসিক ঘটনার ৭৮তম বর্ষপূর্তি উদযাপন করছে। জাতীয়তাবাদে যা নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
মূলত ফিল্ড মার্শাল কারিয়াপ্পার সুযোগ্য নেতৃত্বকে স্মরণ করতে এবং সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী জওয়ানদের জীবন উৎসর্গকে স্বীকৃতি দিতেই এই দিনটি পালন করা হয়। কারিয়াপ্পার অধীনেই ভারতীয় সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা, একতা এবং ধর্মনিরপেক্ষতার মতো আদর্শগুলি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আজও যা এই বাহিনীকে বিশ্বের অন্যতম সেরা বাহিনীতে পরিণত করেছে। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে ১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধ, ১৯৬৫ এবং ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ এবং ১৯৯৯ সালের কারগিল সংঘর্ষে ভারতীয় সেনার বীরত্ব আজও প্রতিটি ভারতবাসীর মনে শিহরণ জাগায়। এছাড়া বিশ্বশান্তি রক্ষায় রাষ্ট্রপুঞ্জের অসংখ্য মিশনে ভারতীয় জওয়ানদের ভূমিকা আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসিত।
আরও পড়ুন: মকর সংক্রান্তিতে গঙ্গাসাগরে পুণ্যস্নানের ঢল, উত্তাল সমুদ্রে প্রাণ বাঁচাল নৌবাহিনী
এ বছর সেনা দিবসের বিশেষত্ব (Indian Army Day 2026)
২০২৬ সালের সেনা দিবসের (Indian Army Day 2026) একটি বিশেষত্ব হল এর নির্ধারিত থিম বা মূল বিষয়ভাবনা। এ বছরের থিম রাখা হয়েছে “ইয়ার অফ নেটওয়ার্কিং অ্যান্ড ডেটা সেন্ট্রিসিটি”। এই বিষয়টি বর্তমান সময়ের আধুনিক যুদ্ধের রণকৌশলের পরিবর্তনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। আধুনিক যুদ্ধ এখন কেবল গোলাবারুদ বা সমরাস্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, ক্রমশ তা প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে। সেনাবাহিনী এখন ডিজিটাল মাধ্যমের ওপর ব্যাপক জোর দিচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, সাইবার নিরাপত্তা এবং অত্যন্ত উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং নিখুঁত লক্ষ্যভেদ করাই এই বছরের প্রধান লক্ষ্য। তথ্যের সঠিক বিশ্লেষণ এবং সমন্বিত নেটওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে প্রযুক্তিগতভাবে শক্তিশালী করার প্রয়াস জারি রয়েছে। এছাড়া ভবিষ্যতে যুদ্ধের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার নিরন্তর প্রচেষ্টা চলছে।
On Army Day, we salute the courage and resolute commitment of the Indian Army.
Our soldiers stand as a symbol of selfless service, safeguarding the nation with steadfast resolve, at times under the most challenging conditions. Their sense of duty inspires confidence and… pic.twitter.com/IRLSsmvRF0
— Narendra Modi (@narendramodi) January 15, 2026
বর্তমান সময়ে ভারতীয় সেনাবাহিনী কেবল সংখ্যাতত্ত্বে নয়, বরং অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতেও বিশ্বসেরা হওয়ার পথে এগিয়ে চলেছে। ড্রোনের ব্যবহার থেকে শুরু করে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং সমন্বিত যুদ্ধ পরিচালনা – সব ক্ষেত্রেই এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসছে। ২০২৬ সালের এই বিশেষ দিনে সেনার এই আধুনিক হয়ে ওঠা এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর বিশেষ আলোকপাত করা হয়েছে। আমাদের বীর জওয়ানরা যাতে লাদাখের হিমাঙ্ক নিচের তাপমাত্রা বা রাজস্থানের উত্তপ্ত মরুভূমিতেও সবলভাবে লড়াই করতে পারেন, তার জন্য উন্নত মানের পোশাক ও পরিকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। সেনাদের কষ্ট খানিক লাঘব করতেই এই প্রয়াস সরকারের।
পরিশেষে বলা যায়, ভারতীয় সেনা দিবস কেবল সামরিক শক্তির আস্ফালন নয়, বরং এটি সেই অদম্য সাহস এবং ত্যাগের প্রতি এক গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি, যারা দিনরাত অতন্দ্র প্রহরীর মতো সীমান্ত পাহারা দিচ্ছেন। তাঁদের জন্যই দেশের কোটি কোটি মানুষ আজ শান্তিতে রাত কাটাতে পারছেন। সেনা দিবস (Indian Army Day 2026) আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, তেরঙ্গার মান রাখতে দেশের জওয়ানরা সর্বদা প্রস্তুত। তাঁদের এই বীরগাথা ভারতের প্রতিটি প্রজন্মের কাছে দেশপ্রেমের চিরন্তন প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। আধুনিক প্রযুক্তি এবং ত্যাগের এই সমন্বয় ভারতকে বিশ্বের দরবারে একটি অপরাজেয় শক্তিতে পরিণত করবে।
