পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হল। দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও জল্পনার অবসান ঘটিয়ে রাজ্যের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীর (Suvendu Adhikari) নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করল বিজেপি নেতৃত্ব। শুক্রবার নিউ টাউনের বিশ্ববাংলা কনভেনশন সেন্টারে নবনির্বাচিত ২০৭ জন বিজেপি বিধায়কের সঙ্গে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের (Amit Shah) ম্যারাথন বৈঠকের পরেই এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরিষদীয় দলনেতা হিসেবে সর্বসম্মতিক্রমে নির্বাচিত হওয়ার পর আগামী শনিবার কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নেবেন শুভেন্দু অধিকারী।
বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হচ্ছেন শুভেন্দু (Suvendu Adhikari)
বিধানসভার নেতা নির্বাচনের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় প্রধান পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খোদ অমিত শাহ। তাঁর সঙ্গে সহকারী পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব সামলেছেন ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহন চরণ মাঝি। বৈঠকের প্রক্রিয়া শেষে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে শাহ বলেন, “পরিষদীয় দলনেতা নির্বাচনের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া আমরা সম্পন্ন করেছি। আমাদের কাছে মোট আটটি প্রস্তাব জমা পড়েছিল এবং প্রতিটি প্রস্তাবেই একটি মাত্র নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল। আমরা দ্বিতীয় কোনো নামের প্রস্তাবের জন্য পর্যাপ্ত সময় দিয়েছিলাম, কিন্তু কোনো বিকল্প নাম উঠে আসেনি। তাই আমি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে ঘোষণা করছি যে, শুভেন্দু অধিকারীই পশ্চিমবঙ্গের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হতে চলেছেন।”
আরও পড়ুন: ৯৮.২৯ শতাংশ পেয়ে রাজ্যে মাধ্যমিকে প্রথম রায়গঞ্জের অভিরূপ, কীভাবে এই সাফল্য?
শুভেন্দুর নাম ঘোষণার সময় (Suvendu Adhikari) শাহের কণ্ঠে ছিল জয়ের তৃপ্তি। তিনি আরও যোগ করেন, “গঙ্গোত্রী থেকে গঙ্গাসাগর পর্যন্ত আজ সর্বত্রই বিজেপি-র আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হল। ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্মভূমিতে আজ তাঁরই আদর্শের অনুসারী এক সরকার গঠিত হতে চলেছে, যা বাংলার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল।”
বিজেপির অন্দরে শুভেন্দুর নাম নিয়ে কৌতূহল থাকলেও, তাঁর রাজনৈতিক কৃতিত্বের কাছে অন্য সব জল্পনা ম্লান হয়ে গিয়েছিল। ২০২১ সালে নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করার পর, ২০২৬-এর নির্বাচনেও তিনি অনন্য নজির গড়েছেন। এবার তিনি নিজের কেন্দ্র নন্দীগ্রামের পাশাপাশি খোদ মুখ্যমন্ত্রীর গড় বলে পরিচিত ভবানীপুরেও মমতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন। কেবল জয় নয়, জয়ের ব্যবধান বাড়িয়ে তিনি সকলকে চমকে দিয়েছেন। ভবানীপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ১৫ হাজারেরও বেশি ভোটে পরাজিত করে তিনি কার্যত নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন। অন্যদিকে, নন্দীগ্রামেও তৃণমূল প্রার্থী পবিত্র করকে ১০ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে নিজের দুর্গ অটুট রেখেছেন তিনি।
বাংলার ইতিহাসে বিরোধী দলনেতা এবং বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীর এমন সম্মুখসমর এবং সেখানে মুখ্যমন্ত্রীর পরাজয় এক বিরল ঘটনা। স্বাভাবিকভাবেই দলের একাংশ মনে করেছিল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো হেভিওয়েট নেত্রীকে তাঁর নিজের এলাকায় ধরাশায়ী করার পর শুভেন্দু ছাড়া অন্য কাউকে এই পদের দায়িত্ব দেওয়া সমীচীন হবে না। যদিও অতীতে বিভিন্ন রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিজেপি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব অনেক সময় নতুন নাম এনে চমক দিয়েছে, কিন্তু বাংলার ক্ষেত্রে শুভেন্দুর এই পর্বতপ্রমাণ সাফল্যকে উপেক্ষা করার ঝুঁকি তাঁরা নেননি। রাজনৈতিক মহলের মতে, শুভেন্দুর বদলে অন্য কাউকে বেছে নিলে দলের অভ্যন্তরে ক্ষোভের সৃষ্টি হতে পারত, যা এই বিপুল জয়ের পর কাম্য ছিল না।
অমিত শাহের ঘোষণার পর এখন নিয়মমাফিক প্রক্রিয়া শুরুর অপেক্ষা। বিধায়কদের সমর্থনের চিঠি নিয়ে শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) রাজভবনে গিয়ে রাজ্যপাল আরএন রবির কাছে সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক দাবি জানাবেন। শনিবারের ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড এখন এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে, যেখানে দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াইয়ের অবসান ঘটিয়ে বাংলার ভাগ্যবিধাতা হিসেবে শপথ নেবেন শুভেন্দু অধিকারী।

