৬ এপ্রিল ২০২৬: আজ থেকে ঠিক ৯৫ বছর আগে ১৯৩১ সালের এই দিনে পাবনা জেলায় (তৎকালীন ব্রিটিশ ভারত) জন্মগ্রহণ করেছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের অবিসংবাদিত সম্রাজ্ঞী সুচিত্রা সেন (Suchitra Sen)। আজ তাঁর ৯৬তম জন্মদিন। যদিও ২০১৪ সালে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছেন, কিন্তু বাঙালির হৃদয়ে তাঁর স্থান আজও অম্লান। তাঁর সেই ভুবনভোলানো হাসি, গভীর চোখ এবং মনমুগ্ধকর অভিনয় তাঁকে করে তুলেছে চিরকালের মহানায়িকা।
সুচিত্রা সেন’কে (Suchitra Sen) রুপোলি পর্দায় ফিরে দেখা
অনেকেই জানেন, সুচিত্রা সেনের আসল নাম ছিল রমা দাশগুপ্ত। ১৯৫২ সালে ‘শেষ কোথায়’ ছবির মাধ্যমে তাঁর চলচ্চিত্র যাত্রা শুরু হলেও ছবিটি মুক্তি পায়নি। ১৯৫৩ সালে ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবিতে উত্তম কুমারের বিপরীতে অভিনয় করে তিনি রাতারাতি তারকা হয়ে ওঠেন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। উত্তম-সুচিত্রা জুটি বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এক সোনালী অধ্যায় হিসাবে রয়ে গিয়েছে। তাঁদের রসায়ন পর্দায় এতটাই জীবন্ত ছিল যে, কয়েক দশক ধরে এই জুটি রাজত্ব করেছে। এমনকি বর্তমান প্রজন্মের কাছেও সমাদৃত এই জুটি।
আরও পড়ুন: ১৮ দিনেই ১০০০ কোটির গণ্ডিতে ‘ধুরন্ধর ২’, ভাঙবে বাহুবলীর রেকর্ড!
সুচিত্রা সেন (Suchitra Sen) কেবল রূপের জন্যই নয়, তাঁর রাশভারি অভিনয়ের জন্যও স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। ‘দীপ জ্বেলে যাই’ ছবিতে নার্সের চরিত্রে তাঁর অভিনয় বা ‘উত্তর ফাল্গুনী’-তে মা ও মেয়ের দ্বৈত চরিত্রে তাঁর পারফরম্যান্স আজও শিক্ষণীয়। ১৯৬৩ সালে ‘সাত পাকে বাঁধা’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য তিনি মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পান। তিনিই ছিলেন প্রথম ভারতীয় অভিনেত্রী যিনি কোনো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হয়েছিলেন। বাংলা সিনেমার পাশাপাশি হিন্দিতেও তিনি ‘দেবদাস’ বা ‘আঁধি’-র মতো কালজয়ী ছবিতে কাজ করেছেন। ১৯৭২ সালে ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানে ভূষিত করে। ২০১২ সালে তিনি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সর্বোচ্চ সম্মান ‘বঙ্গবিভূষণ’ লাভ করেন।
তবে এই মহানায়িকার জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্য ছিল তাঁর লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যাওয়া। ১৯৭৮ সালে ‘প্রণয় পাশা’ ছবিটির ব্যর্থতার পর তিনি অভিনয় জগত থেকে অবসর নেন। এরপর দীর্ঘ ৩৬ বছর তিনি আর কোনোদিন জনসমক্ষে আসেননি। নিজের ব্যক্তিগত জীবনকে তিনি এতটাই আড়ালে রেখেছিলেন যে, ২০০৫ সালে তাঁকে ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র সম্মান ‘দাদাসাহেব ফালকে’ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন, কারণ তিনি জনসমক্ষে আসতে চাননি। নিভৃতচারী এই জীবন তাঁকে হলিউড অভিনেত্রী গ্রেটা গার্বোর সাথে তুলনা করতে বাধ্য করেছে।
সুচিত্রা সেন (Suchitra Sen) মানেই একরাশ রহস্য আর আভিজাত্যের মিশেল। তাঁর প্রতিটি দৃষ্টি, প্রতিটি ভঙ্গি ছিল অতুলনীয়। বর্তমান প্রজন্মের কাছেও তিনি ফ্যাশন এবং অভিনয়ের এক বড় অনুপ্রেরণা। পাবনার পৈত্রিক ভিটে থেকে কলকাতার বেল ভিউ ক্লিনিক—সুচিত্রা সেনের যাত্রা ছিল এক রূপকথার মতো। আজ তাঁর জন্মদিনে দুই বাংলার অগুনতি ভক্ত তাঁকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে। তিনি বেঁচে আছেন তাঁর কাজের মধ্যে, তাঁর সেই মোহময় হাসির মধ্যে।
