Harish Rana: ভারতের চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। দেশের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে আদালতের অনুমতিতে পরোক্ষ ইচ্ছামৃত্যু বা ‘প্যাসিভ ইউথানেশিয়া’ পাওয়ার পর দিল্লির এইমসে (AIIMS) প্রাণ হারালেন হরিশ রানা। মঙ্গলবার দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেসে ৩১ বছর বয়সি এই যুবকের মৃত্যু হয়। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এক যন্ত্রণাদায়ক অবস্থায় থাকার পর অবশেষে তাঁর জীবনের লড়াই শেষ হল। এই ঘটনা ভারতের শেষ মুহূর্তের চিকিৎসা পরিষেবা এবং মানবিক অধিকারের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে থেকে যাবে।
দীর্ঘ ১৩ বছরের এক নিথর সংগ্রাম (Harish Rana)
হরিশ রানা ছিলেন পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাচেলার অফ টেকনোলজি বা বিটেক (BTech) পর্যায়ের একজন মেধাবী ছাত্র। কিন্তু ২০১৩ সালে একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা তাঁর জীবনকে আমূল বদলে দেয়। একটি বহুতলের চারতলার বারান্দা থেকে পড়ে গিয়ে তিনি মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়েছিলেন। সেই সময় থেকেই সে ‘ভেজিটেটিভ স্টেট’ বা একপ্রকার অচৈতন্য অবস্থায় চলে যান। দীর্ঘ ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি শুধুমাত্র কৃত্রিম পুষ্টি এবং মাঝেমধ্যে অক্সিজেনের ওপর নির্ভর করে বেঁচে ছিলেন। তাঁর সুস্থ হয়ে ওঠার কোনো আশা ছিল না বলেই জানিয়ে দেন চিকিৎসকরা। পরিবারের পক্ষ থেকে দীর্ঘ লড়াই চালানোর পর অবশেষে গত ১১ মার্চ ভারতের সুপ্রিম কোর্ট তাঁর ক্ষেত্রে পরোক্ষ ইচ্ছামৃত্যুর অনুমতি দেয়।
আরও পড়ুন: অব্যবহৃত ডেটা নিয়ে সংসদে সরব রাঘব চাড্ডা, টেলিকম সংস্থাগুলির ‘ডেইলি লিমিট’ নীতির কড়া সমালোচনা
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর গত ১৪ মার্চ হরিশকে গাজিয়াবাদের বাড়ি থেকে দিল্লির এইমসের প্যালিয়েটিভ কেয়ার ইউনিটে স্থানান্তরিত করা হয়। সেখানে ডক্টর সীমা মিশ্রের নেতৃত্বে একটি বিশেষজ্ঞ দল তাঁর দেখভালের দায়িত্ব নেয়। এই দলে নিউরোসার্জারি, অনকো-অ্যানাস্থেশিয়া এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞরাও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সাথে তাঁর শরীর থেকে কৃত্রিম জীবনদায়ী ব্যবস্থাগুলি সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। চিকিৎসকদের কড়া নজরদারিতে ধাপে ধাপে তাঁর কৃত্রিম পুষ্টি সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল যাতে তাঁর মৃত্যু মর্যাদাপূর্ণ হয়।
আইনি লড়াই ও ঐতিহাসিক রায়
হরিশ রানার (Harish Rana) এই আইনি যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। প্রথমে তাঁর পরিবার ২০২৪ সালে দিল্লি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল। কিন্তু সেই সময় আদালত তাঁদের আবেদন খারিজ করে দেয়। এরপর পরিবার সুপ্রিম কোর্টের শরণাপন্ন হয়। সুপ্রিম কোর্ট ২০১৮ সালের একটি ঐতিহাসিক রায়কে ভিত্তি করে হরিশের আবেদনটি খতিয়ে দেখে। সেই রায়ে বলা হয়েছিল যে মর্যাদার সাথে মৃত্যুবরণ করাও অনুচ্ছেদ ২১-এর অধীনে জীবনের অধিকারের একটি অংশ। বিশেষজ্ঞ মেডিক্যাল বোর্ড পরীক্ষা করে জানায় যে হরিশের সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা শূন্য। এর পরেই প্রধান বিচারপতি সহ ডিভিশন বেঞ্চ এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত প্রদান করেন।
#BREAKING : Harish Rana has died at AIIMS Delhi after being in a coma for over 13 years. He was among the first individuals in India permitted passive euthanasia.#HarishRana #AIIMS #Euthanasia pic.twitter.com/ZG8MXCAhGk
— upuknews (@upuknews1) March 24, 2026
ভারতের চিকিৎসা ব্যবস্থায় এই ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি আইনি কাঠামো তৈরি করে দিয়েছে। আদালত কেন্দ্রীয় সরকারকে এই ধরণের পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে একটি সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়নেরও পরামর্শ দিয়েছে। হরিশ রানার (Harish Rana) মৃত্যু একদিকে যেমন তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের জন্য শান্তির বার্তা বয়ে এনেছে, তেমনি অন্যদিকে চিকিৎসা নীতিশাস্ত্রের ওপর নতুন করে আলোচনার সুযোগ করে দিয়েছে। শেষ মুহূর্তের যত্নে মর্যাদা এবং মানবিকতাকে প্রাধান্য দেওয়ার এই নজির ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
